থমকে গেছে ইবির উন্নয়ন: উচ্চ আদালতে ঠিকাদারের রিট

অথর
সময়ের দিগন্ত ডেক্স :   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ৮:১১ পূর্বাহ্ণ | নিউজটি পড়া হয়েছে : 172 বার
থমকে গেছে ইবির উন্নয়ন: উচ্চ আদালতে ঠিকাদারের রিট ফাইল ছবি

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ থমকে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। টেন্ডার জমাকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের যোগ্যতা ও মূল্য ছাড় নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় আটকে গেছে কাজের নির্দেশনা। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কাজ না পাওয়ায় উচ্চ আদালতে রিট করেছে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

২০১৮ সালে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ৫৩৭ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের অনুমোদন পায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে ছিল ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য পৃথক চারটি ১০ তলা হল। প্রকল্পের কাজগুলো শুরু করতে কনসালট্যান্ট নিয়োগ করে ড্রইং ডিজাইন ইস্টিমেট তৈরি করার সময় গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্ধারিত রেট শিডিউল বেড়ে যায়। ফলে কাজগুলো নির্ধারিত বাজেটের চেয়ে প্রায় ২৫ শতাংশ খরচ বেড়ে যায়। পরে ২০১৮ সালের রেট শিডিউল অনুযায়ী ফের ইস্টিমেট তৈরি করে অনুমতি মিললে ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্র হল-১ এবং ৫ মার্চ ছাত্রী হল-১-এর টেন্ডার আহ্বান করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে দুই দফা টেন্ডারের তারিখ পেছানো হয়। ১৩ ও ১৪ মে টেন্ডার গ্রহণ করে উন্মুক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল অফিস। কিন্তু টেন্ডার জমাকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের যোগ্যতা ও মূল্য ছাড় নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় আটকে যায় কাজের নির্দেশনা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল দপ্তর জানায়, ১০৬ কোটি টাকা মূল্যের পৃথক দুটি দরপত্রে ১০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টেন্ডার জমা দেয়। এর মধ্যে ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কারণে তাদের টেন্ডার তুলে নেয়। পরে দুই কাজের জন্য মেসার্স রহমান ট্রেডার্স ও ম্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের টেন্ডার যাচাই-বাছাই হয়। এদের মধ্যে রহমান ট্রেডার্স সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও টেন্ডারে নির্ধারিত সব শর্ত যথাযথ পূরণ করেনি। কিন্তু ম্যাক দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও টেন্ডারের সব শর্ত যথাযথ পূরণ করেছিল। এ কাজের টেন্ডার নোটিশ প্রকাশের সময় তিনটি শর্ত দেয় কর্তৃপক্ষ। এতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডার প্রকাশের তারিখ থেকে আগের পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত ৩০ কোটি টাকার এককভাবে আটতলা ভবন নির্মাণের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু রহমান ট্রেডার্সের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের পাঁচ মাস ২৯ দিন বেশি হয়। এ ছাড়া অন্যান্য যোগ্যতায় ম্যাকের চেয়ে তারা পিছিয়ে আছে বলে জানা গেছে। কিন্তু পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিআর) অনুযায়ী কাজের নির্দেশ প্রদানে জটিলতার মুখে পড়ে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে মেয়াদ শেষ হওয়ায় উপাচার্য পরিবর্তন হয়। পরে ৯ নভেম্বর নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ আবদুস সালামের কাছে টেন্ডার মূল্যায়নপত্র দেওয়া হলে ফের পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন করে নতুন করে সুপারিশ করার জন্য কমিটিকে নির্দেশ দেন।

এর পর গত ৩ ফেব্রুয়ারি টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সপ্তম সভায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করে তিনটি সুপারিশসহ উপাচার্যের কাছে পেশ করে। সুপারিশ তিনটি হলো- সর্বনিম্ন দরদাতা মেসার্স রহমান ট্রেডার্সের পাঁচ মাস ২৯ দিনের সময় ব্যত্যয়কে ধর্তব্য না নিয়ে কার্যাদেশ দেওয়া অথবা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ম্যাকের কার্যাদেশ দেওয়া অথবা বাজারমূল্য বৃদ্ধি, দরদাতার কম দর প্রদান এবং সব প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় স্বল্পতা প্রভৃতি বিবেচনা করে এই দরপত্র বাতিল করে নতুনভাবে দরপত্র আহ্বান করা। তবে প্রথম ও শেষের সিদ্ধান্তের সঙ্গে টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক মাহবুবর রহমান দ্বিমত পোষণ করে রহমান ট্রেডার্স সব শর্ত যথাযথ পূরণ না করায় ম্যাককে কার্যাদেশ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেন।

এই টেন্ডার জটিলতার মধ্যে গত দুই ফেব্রুয়ারি টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি পুনর্গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবর রহমানের পরিবর্তে কুষ্টিয়া অঞ্চলের গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে বাইরের সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক এইচ এম আলী হাসানকে সভাপতি, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মুন্সী শহীদ উদ্দীন মো. তারেককে সদস্য সচিব করা হয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের মাঝপথে এসে টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়ে

ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। পরে পরিকল্পনা দপ্তরের পরিচালকের কাছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির নিদের্শনা ও পুনর্গঠনের কপি চান তিনি।

এদিকে ৯ ফেব্রুয়ারি ম্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদ মুরাদ উচ্চ আদালতে রিট করেছে। এতে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সাবেক ও বর্তমান সদস্যরাসহ ১১ জনকে বিবাদী করা হয়েছে। পরে বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) আতাউর রহমান বরাবর উকিল নোটিশ পাঠিয়েছেন।

এ বিষয়ে অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলেন, ‘অস্বচ্ছ পন্থায় যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে বঞ্চিত করে বিজ্ঞাপনের শর্ত পূরণ না করা সত্ত্বেও একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অশুভ চক্রের হস্তক্ষেপ আজকের এই পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।’

এ বিষয়ে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) আলিমুজ্জামান টুটুল বলেন, ‘টেন্ডার হলে ইঞ্জিনিয়ারদের ওপর বিভিন্ন চাপ আসে। আমি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সাবেক ভিসির মেয়াদ শেষ হয়। পরে নতুন ভিসিকে ফাইল পাঠানো হলে তিনি খোঁজ-খবর নিতে হয়তো দেরি হয়েছে।’

বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মুন্সী শহীদ উদ্দীন মো. তারেক বলেন, ‘টেন্ডার নিয়ে কোনো সমস্যা হলে প্রতিষ্ঠান প্রধান পিপিআর অনুযায়ী আইনগতভাবে রি-টেন্ডার করতে পারেন। ভিসি নতুন এসে ফাইল নিয়ে মন্ত্রণালয়ে গেছেন, প্লানিংয়ে গেছেন। এর পর বিভিন্ন খোঁজ-খবর নিয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।’

এইচএম আলী হাসান বলেন, ‘রহমান ট্রেডার্সের ব্যত্যয় উপেক্ষা করে কাজের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা ভিসির আছে। মন্ত্রণালয় থেকে তিনজন এসেছিলেন। আইনগতভাবে মাহবুবর রহমান টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন। আসলে প্ল্যানিংয়ের বিষয়গুলো তো টাইম টু টাইম চেঞ্জ হয়।’

উপাচার্য অধ্যাপক শেখ আবদুস সালাম বলেন, ‘টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি সাতটি সভা করলেও একমতে পৌঁছাতে পারেনি। ২০১৮ সালের পিডব্লিউ রেট অনুযায়ী তখন দরপত্র করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালের নতুন রেট চূড়ান্ত হয়েছে। ফলে সব কিছুর বাজারমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া পিপিআরের নিয়ম অনুযায়ী এখানে কাজের প্রতিযোগিতা হয়নি। যেহেতু আমরা এখনও কাজ সম্পন্ন করার সময় পাব, তাই রি-টেন্ডারের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।’

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেয়ার করে  সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *