দর্শক খরা-লোকসানে বন্ধ কুষ্টিয়ার ১২ হলই

অথর
সময়ের দিগন্ত ডেক্স :   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :৩ এপ্রিল ২০২১, ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ | নিউজটি পড়া হয়েছে : 16104 বার
দর্শক খরা-লোকসানে বন্ধ কুষ্টিয়ার ১২ হলই

শহরে চারটি আর ছয় উপজেলায় আটটিসহ মোট ১২টি সিনেমা হল ছিল কুষ্টিয়ায়। তবে মানসম্পন্ন সিনেমার অভাব আর আকাশ সংস্কৃতির দাপটে দিন দিন কমে যায় দর্শক। এতে লোকসানে পড়তে থাকেন হল মালিকরা। এতে ১১টি হল এখন হাঁড়ি-পাতিলের গোডাউন আর কমিউনিটি সেন্টারে রূপ নিয়েছে।

জানা যায়, ৬০-এর দশকে শহরের প্রাণকেন্দ্রে সর্বপ্রথম গড়ে উঠেছিল রকসি সিনেমা হল। সেটি ২০০৩ সালে বন্ধ হয়েছে। বর্তমানে সেটি হাঁড়ি-পাতিলের গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সংস্কৃতির রাজধানী কুষ্টিয়ার প্রাণকেন্দ্র এনএস রোডে পরিমল থিয়েটার কর্তৃপক্ষ নির্মাণ করেছিলেন কেয়া সিনেমা হল। সেটি ভেঙে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতলবিশিষ্ট বাণিজ্যিক ভবন ‘পরিমল টাওয়ার’।

পৌরসভার বাণী সিনেমা হলটি প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ। এখন পৌরসভার কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। কুষ্টিয়া পৌরসভার কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন আজাদ নামের এক ব্যবসায়ী হলটি পরিচালনা করতেন।

তিনি জানান, ছবির মান ক্রমাগত নিম্নমুখী এবং আকাশ সংস্কৃতির দাপটে দর্শকরা হল বিমুখ। তাই অব্যাহত লোকসানের কারণে হল বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন।

সিনেমা হলের সুদিন ফেরাতে বুকিং এজেন্টে তদারকির বিষয়ে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। সেই সঙ্গে ট্যাক্স, খাজনা কমাতে হবে বলে জানান বনানী সিনেমা হলের কর্মচারী খালেক বারী।

রকসী হলের মালিক জামাল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে প্রায় প্রতিটি ছবিই হাউসফুল হতো। কিন্তু এখন দর্শকরা আর আসতে চায় না। তাই হল বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে এ শিল্পে জড়িতরা এখন ভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছেন।’

কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ছাত্র আরাফাত বলেন, পরিবার নিয়ে হলে ছবি দেখার পরিবেশ আনতে হবে। সামাজিক, কাহিনী নির্ভর ও ডিজিটাল প্রিন্টে ছবি নির্মাণ করতে হবে। তবেই বাংলা সিনেমার সেকাল ফিরবে।

বনানী হল মালিক বকুল হোসেনের মতে, ভালো কাহিনীর ছবি নির্মাণ, হলের নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ উন্নত ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারি ঋণ সহায়তা দেয়া হলে বন্ধ সিনেমা হল আবার চালু সম্ভব।

কুষ্টিয়ার খোকসার সিনেমা হলগুলো কার্যত বন্ধ হয়েছে ১০ বছর আগে। এরইমধ্যে একটি হলের অবকাঠামো ভেঙে গোডাউন করা হয়েছে। অপরটি ভাঙার প্রস্তুতি চলছে।

আশির দশকে উপজেলা সদরের পাটের গোডাউন ভেঙে তৈরি হয় প্রথম সিনেমা হল। পরে এক কিলোমিটারের মধ্যে তিনটি হল নির্মাণ হলেও প্রায় দুই যুগ ধরে সবকটি হল চুটিয়ে ব্যবসা করেন।

জানা গেছে, খোকসা বাজারের মধ্যে জনবহুল এলাকার অপর্ণা হলটিও বন্ধ হয়ে গেছে। এটি এখন ভাঙার পরিকল্পনা চলছে। আশির দশকে নির্মিত মনামী হলটিও কার্যত বন্ধ রয়েছে। আগে ঈদ-পূজায় দর্শক হলেও এখন সেটাও হয় না। এটিও ভাঙা হবে বলে জানা গেছে।

প্রবীণ সিনেমা ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন খোকন দুটি সিনেমা হলের মালিক। একটি হল এরইমধ্যে ভেঙে দিয়েছেন, আরেকটি ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি সিনেমা ব্যবসা বন্ধের জন্য দায়ী করেন প্রযুক্তির অপব্যবহার ও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকে।

আমজাদ হোসেন বলেন, ‘বর্তমান সরকার প্রণোদনার মাধ্যমে সিনেমা ব্যবসার সুদিন ফেরাতে চায়। কিন্তু প্রণোদনার ঋণের সুদ ৪ শতাংশ বলা হলেও প্রকৃত পক্ষে ৯ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে। ফলে ব্যবসায়ীরা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না।’

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কুমারখালী উপজেলার হল বাজার এলাকায় শাপলা সিনেমা হল নির্মিত হয়। সেটিও প্রায় বছর দশেক আগে বন্ধ হয়েছে। হলের চারপাশ জুড়ে গড়ে উঠেছে মার্কেট। আর হলটি গুদামঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভেড়ামারা উপজেলায় তিনটি সিনেমা হলের মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন শহরের কোচস্ট্যান্ডের পাশে সজনী সিনেমা হলটি ৩-৪ বছর ধরে বন্ধ। পাশেই ছিল লাবনী হল। সেটিও বছর ৫-৬ আগে বন্ধ হয়ে গেছে।

সর্বশেষ বছর দুয়েক আগে বন্ধ হয়ে গেছে শহরের চৈতন মধ্যবাজার এলাকার রুপাঞ্জলী হলটি। এরমধ্যে সজনী আর লাবনী হলটি গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর রুপাঞ্জলী হল ভেঙে হোটেলসহ মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে।

আশির দশকে গড়ে ওঠা মিরপুর উপজেলার বঙ্গবন্ধু সড়কে অবস্থিত নন্দিতা হলটি ২০০০ সালের দিকে বন্ধ হয়ে যায়। এখন সেখানে বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে। দৌলতপুর উপজেলায় তিনটি সিনেমা হলের সবগুলোই এখন বন্ধ। আল্লারদর্গা এলাকার প্রথম সিনেমা হল আশা। সেটিও গত এক দশক ধরে বন্ধ। প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ তারাগুনিয়া এলাকার অলংকার সিনেমা হল। হলটি ভেঙে জমিও বিক্রি হয়ে গেছে। আর উপজেলার হোসেনাবাদ এলাকার রজিনা হলটি এক দশকের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেয়ার করে  সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − 3 =


আরও পড়ুন