প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও অনলাইন শিক্ষা

অথর
মোঃ আবু তালহা  নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত :২৩ জানুয়ারি ২০২১, ৪:০০ পূর্বাহ্ণ | নিউজটি পড়া হয়েছে : 251 বার
প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও অনলাইন শিক্ষা

এক, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অভূতপূর্ব সম্প্রসারণে পৃথিবী আজ আক্ষরিক অর্থেই আমাদের হাতের মুঠোয়। যোগাযোগ প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব সম্প্রসারণের উপকারিতা করোনাকালীন সমগ্র জাতি আদৃষ্ট হচ্ছে। করোনা মহামারি সামগ্রিক পরিস্থিতিকে এভাবে দুমড়ে-মুচড়ে উলট-পালট করে দিবে সত্যিই তা কেউ অনুধাবন করতে পারেনি।

গত মার্চের শুরুতেও কি কেউ চিন্তা করেছিল লক্ষ-লক্ষ শিক্ষার্থী ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক, ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে বসে পড়শোনা করবে? আবার শিক্ষা ক্ষেত্রে ‘নিউ নরমাল’ পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য ভার্চুয়াল ডিসট্যান্স পদ্ধতি কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে?
যদিও আমরা এখনো দেশকে পুরোপুরি ফ্রি ইন্টারনেট সেবার আওতায় আনতে পারিনি, কিংবা নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্তদের অনেকে এই সেবার ক্রয়ক্ষমতা অর্জন করে উঠতে পারেনি। তারপরও অনলাইন শিক্ষাক্রম করোনার সংকটকালে নাই মামার চাইতে কানা মামার ভূমিকায় যে অধিক সফলতার সঙ্গে অবতীর্ণ হতে পারেছে সে কথা অস্বীকার করারও সুযোগ নেই।
করোনাকলীন দূরবর্তী শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া এবং অন্যদিকে মধ্য ও নিম্নআয়ের শিক্ষার্ক্ষীদের সম্পৃক্ত করা- এ দুয়ের সুসমন্বয় ঘটাতে চাইলে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ফ্রি স্টুডেন্ট ডাটা প্যাক নিশ্চিত করার পাশাপাশি যাদের অনলাইন ক্লাস উপযোগী ডিভাইস নেই তাদের জন্য শিক্ষার্থী বান্ধব শর্তে ডিভাইস ব্যবস্থা এই ক্লাস প্রক্রিয়াকে আরো তরান্বিত করবে।

দুই, এসডিজি-৪ মতে, মানসম্মত শিক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতা-ভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য আজীবন শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা । শিক্ষার টেকসই উন্নয়নে যা অবসম্ভী ।
এ-ক্ষেত্র বাস্তবায়নে শিক্ষা টেলিভিশনের কোনো বিকল্প দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। আবার শিক্ষায় করোনাকালীন ‘নিউ নরমাল’ মোকাবিলায় অন্যতম যুতসই ব্যবস্থা হলো শিক্ষা টিভি প্রবর্তন।

যদিও নিম্ন ও মধ্যমআয়ের দেশগুলোতে ১৯৫০-এর দশক থেকেই টেলিভিশনের মাধ্যমে শিক্ষার প্রযুক্তি কম-বেশি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সম্প্রতি এটি আরও বেশি যুগপোযোগী হয়ে উঠেছে।
বস্তুত, শিক্ষা প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আইটি টুলসের বহুমাত্রিক ব্যবহারের মাধ্যমে অনলাইন ক্লাস রুমকে অধিকতর আকর্ষণীয়, অংশগ্রহণমূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপোযোগী করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।সময়োপযোগী শিক্ষাপদ্ধতি বেছে নিতে শিক্ষা-প্রযুক্তির বহুমাত্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করা ছাড়া উপায় নেই।
কিন্তু বাংলাদেশের মতো এশিয়া-আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোয় যেখানে সব মানুষের পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ্য পুরোপুরি বিকশিত হতে পারেনি এবং সে কারণে প্রজন্ম জেড, কিংবা প্রজন্ম আলফা-ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত দেশগুলোতে জন্মানো জেড কিংবা আলফা প্রজন্মের মতো সমভাবে বিকশিত হতে পারেনি। সেই সুবর্ণ সময় না আসা পর্যন্ত শিক্ষা টিভি ব্যবহারের- ওপর নির্ভর করাটায় মনে হয় অধিকর যুক্তিযুক্ত।

টেলিভিশন একটি শক্তিশালী অডিও-ভিজুয়াল যন্ত্র যাকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে শিক্ষা কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। টেলিভিশনসংক্রান্ত সাম্প্রতিক আবিষ্কারগুলো যে স্মার্টবোর্ড প্রযুক্তির জন্ম দিয়েছে তা শিক্ষকরা খুব সহজেই শিক্ষাদানের কাজে ব্যবহার করতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন অডিও-ভিজুয়াল এই মাধ্যমটির মাধ্যমে শিক্ষাপ্রদান ইন্দ্রিয় উদ্দীপনা তত্ত্বানুসারে অধিকতর কার্যকর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। বস্তুত, মুখোমুখি শিক্ষায় আরও কার্যকরভাবে এই কাজটি হয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রত্যক্ষ উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে দৃশ্যমান শিক্ষকের পাঠদান। সেদিক থেকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের একটি অধিকর গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে টেলিভিশন শিক্ষাই সর্বাধিক গ্রাহ্য। আর শুধু শিক্ষাদানই কেন, একজন শিক্ষার্থীকে সময়োপযোগী, সমাজ সচেতন, পরিবেশ সচেতন হিসেবে গড়ে তুলতে কিংবা তার মধ্যে সফট স্কিলস ডেভেলপমেন্টের জন্যও এই শিক্ষার বিকল্প নেই।

তিন, কিন্তু প্রশ্ন হলো- কি হবে সেই শিক্ষা টেলিভিশনের স্বরূপ? এটি কি কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি টিভি হবে?
নাকি, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরশিক্ষণ কার্যক্রম যেভাবে চালানো হয় সেভাবে চালান হবে?
চীন, জাপান, ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে টেলিভিশন কিংবা রেডিওর মাধ্যমে শিক্ষা প্রদানের অনেক নমুনা আছে। করোনাকালে তারা সেসব উপায় প্রয়োগ করে ‘নিউ নরমাল’ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। তাই বাংলাদেশেও শিক্ষা ক্ষেত্রে ‘নিউ নরমাল’ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষায় এ ধারণাটিও কাজে লাগানো যায়। কিন্তু সেখানেও প্রচুর চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে একটি শিক্ষা টিভি প্রতিষ্ঠিত করে শিক্ষার বিচিত্র শাখা-প্রশাখার ওপর তৈরি করা কনটেন্ট সুবিন্যস্তভাবে পরিবেশন করা সহজসাধ্য নয়।

সেক্ষেত্রে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা আলাদা ইউটিউব চ্যানেল ও ফেজবুক পেজ করে সম্প্রচার করাটা কঠিন কিছু নয়।
শিক্ষাপ্রযুক্তির এক চমৎকার রূপায়ন হলো অডিও-ভিজুয়াল মাধ্যম। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের দিয়ে কনটেন্ট প্রস্তুত করে আপাতত ডিপার্টমেন্ট নিয়ন্ত্রিত একটি শক্তিশালী চ্যানেল কিংবা একাধিক চ্যানেলের মাধ্যমে পরিবেশন করা গেলে বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বাড়তি সুবিধার দিক খুলত। পরবর্তিতে পোস্ট-কোভিডকালেও তা কাজে লাগানো যেত।

তথ্য, ধারণা, দক্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবেশনায় অডিও ভিজুয়াল শিক্ষণ গুরুত্ব গবেষণা স্বীকৃত। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শিক্ষা টিভিতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন লক্ষ্য করলেই শিক্ষা টিভির গুরুত্ব আঁচ করা যায়।

বিবিসির মতে ‘গৃহ এবং পাঠশালার পর মানবজাতির ওপর গভীর প্রভাব সৃষ্টি করতে অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমের তুলনায় টেলিভিশনের ভূমিকা সর্বাধিক।’ আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক সব ধরনের শিক্ষা প্রদানে গণমাধ্যম হিসেবে টেলিভিশনের ভূমিকা অগ্রগণ্য। ইলেকট্রনিক এই মাধ্যমটিকে শিক্ষাপদ্ধতি এবং কোর্স-কারিকুলামের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন উদ্দেশ্য এবং উপায়ে ব্যবহার করা যেতে পারে। পাঠ্যবস্তুর ব্যবহারিক প্রয়োগ এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রদর্শন করা যেতে পারে। দূরশিক্ষণের মানবিকীকরণ, বাস্তবধর্মী, জীবন ঘনিষ্ঠ দৃষ্টান্ত প্রদর্শন, কেসস্টাডি প্রভৃতির মাধ্যমে টেলিভিশন ফলাফল নির্ভর এডুকেশনের উৎস হিসেবে বাস্তব ক্লাসরুম প্রশিক্ষণের যোগ্যতর বিকল্প হতে পারে।

যা হোক, টেলিভিশন শিক্ষা ভালো-না মন্দ তা বিচারের এ লেখার প্রতিপাদ্য নয়। করোনা পরিস্থিতির শিকার শিক্ষার্থীদের জন্য আপতকালীন বিকল্প দরকার আছে। তবে স্কুল শিক্ষক আর অস্থিরমতি তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন শিক্ষা এবং অপেক্ষাকৃত বয়স্ক শিক্ষার্থী যাদের বিরামহীন প্রযুক্তি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এবং যারা অধিকতর দায়িত্বশীল তাদের জন্য দূরশিক্ষায় বেশি কার্যকর।

প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার শিক্ষাদর্শনের মূল কথা হলো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের রকমারি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী জনসম্পদ তৈরির জন্য এবং অর্জিত ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে ফলাফলনির্ভর শিক্ষাকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আর সেজন্য দরকার শিক্ষাকার্যের ধারাবাহিকতা। করোনা পরবর্তী এই শিক্ষা-কার্যক্রম আমাদের নিয়মিত ও ধারাবাহিক শিক্ষা-কার্যক্রমের সঙ্গে  একীভূত হয়ে টেকসই দিক উন্মোচন করবে এটায় আমাদের প্রত্যয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেয়ার করে  সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × 2 =


আরও পড়ুন