দুদকের শীর্ষ পদের জন্য সচিবালয়ে দৌড়ঝাঁপ
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্বে কে আসছেন—এ নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। এবার দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে নিয়োগ পেতে নজিরবিহীন আগ্রহ দেখা গেছে। ইতোমধ্যে নিয়োগের জন্য গঠিত সার্চ কমিটির কাছে তিন শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে।
সূত্র জানায়, সার্চ কমিটিতে জমা পড়া আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই চলছে।
এরই মধ্যে শুরু হয়েছে সচিবালয়ে দৌড়ঝাঁপ। বেশ কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, সাবেক সচিব এবং আইনজীবী দেখা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে। কেউ কেউ চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়ের দুজন অবসরপ্রাপ্ত জজ এবং সাবেক কয়েকজন সচিব মন্ত্রণালয়ে এসেছিলেন। এর মধ্যে এক জজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানিয়েছেন।
দেশের একমাত্র দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা দুদক গত চার মাস ধরে কার্যত অচলাবস্থায় আছে। নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ না হওয়ায় মামলা দায়ের, আদালতে চার্জশিট দাখিল, সম্পত্তি জব্দ, আসামিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা এবং গ্রেপ্তারের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনি কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। গত ২ জুলাই দুদক চেয়ারম্যান এবং কমিশনারের জন্য আবেদন আহ্বান করা হয় এবং জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল ১৩ জুলাই।
এবার দুদকের নেতৃত্বের জন্য নজিরবিহীন আগ্রহ দেখা গেছে। চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটির কাছে তিন শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে। আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেনÑঅবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সাবেক সচিব, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, প্রশাসনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী। এত বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়ায় দুদকের নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সার্চ কমিটি প্রার্থীদের পেশাগত অভিজ্ঞতা, সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা, দুর্নীতি দমনের বিষয়ে অবস্থান, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং জনস্বার্থে কাজের রেকর্ডসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই-বাছাই করছে। এরপর যোগ্য ব্যক্তিদের সংক্ষিপ্ত তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। সেখান থেকে আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হবে।
দুদকের বর্তমান বাস্তবতায় নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন প্রশাসন বিশ্লেষক, আইনজ্ঞ ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা। তাদের মতে, দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার প্রতি জনআস্থা বাড়াতে হলে নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিদের আনতে হবে, যাদের সততা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুদকের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপর্যায়ে কাজ করার সুযোগ এবং দেশে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে ভূমিকা রাখার আগ্রহ থেকেই এত বিপুলসংখ্যক আবেদন এসেছে। তবে আবেদন বেশি হওয়ার অর্থ এই নয় যে, সবাই সমানভাবে যোগ্য। চূড়ান্ত নির্বাচন নির্ভর করবে আইনগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও সার্চ কমিটির মূল্যায়নের ওপর।গুরুত্ব পাচ্ছে সততা ও নিরপেক্ষতা
সার্চ কমিটির একটি সূত্র জানায়, আবেদনকারীদের অতীত কর্মজীবন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আর্থিক স্বচ্ছতা, জনপরিসরে গ্রহণযোগ্যতা এবং নৈতিক অবস্থান গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, বিতর্ক বা স্বার্থের সংঘাতের বিষয় থাকলে সেটিও মূল্যায়নের আওতায় আসছে।
দুদকসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শুধু প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নয়; দুর্নীতি দমনে দৃঢ় অবস্থান এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়নের সক্ষমতাও নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
নতুন নেতৃত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
অনেকেই মনে করছেন, দুদকের নতুন নেতৃত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। দীর্ঘদিন ধরেই কমিশনের তদন্তের গতি, মামলা নিষ্পত্তির সময়, উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন আলোচিত মামলার অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কমিশনের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হবে জনগণের আস্থা পুনর্গঠন। দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে বৈষম্যের অভিযোগ দূর করা, পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দক্ষ জনবল ব্যবস্থাপনার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে তাদের।
দুদক আইন অনুযায়ী, কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের আগে সার্চ কমিটি সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে মতামত গ্রহণ ও যাচাই-বাছাই করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ পাঠায়। ওই সুপারিশের ভিত্তিতেই নিয়োগ সম্পন্ন হয়। এ কারণে সার্চ কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়া যত বেশি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হবে, কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে জনমনে তত বেশি ইতিবাচক বার্তা যাবে। কারণ দুদকের কার্যকারিতা অনেকাংশেই নির্ভর করে নেতৃত্বের স্বাধীনতা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার ওপর।
এ বিষয়ে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারের পদ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি এসব পদের জন্য দরখাস্ত করে সরকারের কারো সঙ্গে দেখা করেন, তবে তা অযোগ্যতা হিসেবে গণ্য করা উচিত। তিনি বলেন, কেউ যদি সচিবালয়ে গিয়ে থাকেন, তাহলে তার ব্যক্তিগত স্বার্থ আছে।সাবেক এই আমলা বলেন, যারা ভালো মানুষ, দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানে তাদের অফার করলেও তারা ১০ বার ভাববেন, এখানে যাওয়া উচিত হবে কি না। তিনি বলেন, এসব পদে লবিং করে যারা যেতে চান, তাদের দিয়ে ভালো কাজ আশা করা যায় না। সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে যারা সৎ এবং যাদের মধ্যে দুর্নীতি কমানোর নেশা আছে, তাদের এ পদে আনা।
নজর সার্চ কমিটির সুপারিশে
দুদকে অচলাবস্থার অবসানে গত ২২ জুন আপিল বিভাগের বিচারপতি রেজাউল হককে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেনÑহাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি রাজিক আল জলিল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নুরুল ইসলাম, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেম এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। সার্চ কমিটি এ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে একটি বৈঠক করেছে বলে জানা গেছে।
এই কমিটি আগ্রহীদের আবেদন যাচাই-বাছাই করে ছয়জনের নামের তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে। ওই তালিকা থেকে তিনজনকে কমিশনার নিয়োগ দিয়ে ওই তিনজনের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি।
সার্চ কমিটি কাদের সংক্ষিপ্ত তালিকায় রাখে এবং শেষ পর্যন্ত কারা চেয়ারম্যান ও কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।