লোডশেডিংয়ে দিশাহারা প্রান্তিক পোলট্রি খামারিরা
তীব্র গরমের মধ্যে টানা লোডশেডিংয়ের কারণে একদিকে হিটস্ট্রোকে মারা যাচ্ছে মুরগি, অন্যদিকে আশঙ্কাজনকভাবে কমছে ডিমের উৎপাদন। জ্বালানি ও খাদ্যের বাড়তি খরচের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট পাবনা প্রান্তিক পোলট্রি খামারিদের ঠেলে দিচ্ছে চরম লোকসানের দিকে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে অনেক খামারই স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্বল্প বিনিয়োগে ভালো লাভ এবং সহজ বিপণন ব্যবস্থার কারণে ২০০০ সালের পর থেকে পাবনায় দ্রুত প্রসার ঘটে পোলট্রি শিল্পের। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় জেলাজুড়ে গড়ে ওঠে কয়েক হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামার। একপর্যায়ে দেশের অন্যতম প্রধান ডিম উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে পরিচিতি পায় পাবনা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এখানকার ডিম সরবরাহ হতো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। সেই রমরমা ব্যবসায় এখন নেমে এসেছে হতাশা।খামারিদের অভিযোগ, বড় পুঁজির সিন্ডিকেটের কারসাজিতে গত কয়েক বছর ধরে মুরগির বাচ্চা, ফিড ও ওষুধের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়েনি ডিম ও মুরগির দাম। অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ইতোমধ্যে ব্যবসা গুটিয়েছেন সাত হাজারের বেশি প্রান্তিক খামারি। এরপরও যারা কোনোমতে টিকে ছিলেন, তাদের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে ভয়াবহ লোডশেডিং।
সদর উপজেলার সানিকদিয়ার মণ্ডলপাড়া এলাকার এক খামারি বলেন মাসখানেক আগে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে খামারে ৩৫০টি ব্রয়লার মুরগি তুলেছিলেন। খাবার, ওষুধ ও বাচ্চা মিলিয়ে বিনিয়োগ প্রায় এক লাখ টাকা। কিন্তু গত এক সপ্তাহে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে প্রতিদিন টানা পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে গরমের কারণে মারা গেছে তার ৮০টি মুরগি।
তিনি আরো জানান,কারেন্ট তো থাকেই না। গরমে মানুষেরই টিকে থাকা দায়, সেখানে মুরগির কথা কী বলব! গড়ে আড়াই কেজি ওজনের ৮০টা মুরগি মারা যাওয়ায় ৩০ হাজার টাকা লস হয়েছে। বাকি মুরগিগুলোও কম দামে বিক্রি করে দিয়েছি। এমন অবস্থা চলতে থাকলে পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।শুধু নাজমা নন, জেলাজুড়েই পোলট্রি খামারিদের একই চিত্র। প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে লেয়ার, ব্রয়লার ও সোনালি জাতের ৩,০৪৩টি মুরগির খামার রয়েছে। অথচ পাঁচ বছর আগেও এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার।গত দুই-তিন বছরে দফায় দফায় পোলট্রি ফিড, বাচ্চা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ভ্যাকসিনের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। ২,৪০০ টাকার এক বস্তা ফিড এখন বিক্রি হচ্ছে ৩,৪০০ টাকায়। বেড়েছে ওষুধের দামও। ডলারের মূল্য বৃদ্ধির পর অনেক ভ্যাকসিন ও ওষুধের আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে কোম্পানিগুলো। এতে রাণীক্ষেতসহ বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাবও বেড়েছে। এর সঙ্গে নতুন বিপদ হিসেবে যুক্ত হয়েছে তীব্র লোডশেডিং, যা খামারিদের সর্বস্বান্ত করার উপক্রম করেছে।খামারিরা জানিয়েছেন, পাবনায় বর্তমানে দিন-রাত মিলিয়ে ৬-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকায় পরিস্থিতি আরো খারাপ। ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির খাদ্য ও পানি সরবরাহ, সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখা এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের কোনো বিকল্প নেই। বিদ্যুৎ না থাকলে অক্সিজেনের ঘাটতিতে মুরগির শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং হিটস্ট্রোকে মারা যায়। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর বা আইপিএস ব্যবহার করতে গিয়ে খামারিদের উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
সদর উপজেলার মালিগাছা ইউনিয়নের মাহমুদপুর বাজারের লেয়ার খামারি জানান,খামারে ৩,৩০০ মুরগির মধ্যে এখন টিকে আছে মাত্র ১,০০০। খামারের দায়িত্বে থাকা নাজমুল জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে মুরগি কম খাবার খাচ্ছে, রোগবালাই বাড়ছে এবং ডিমের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। আগে ১,০০০ মুরগি থেকে দিনে ৩২-৩৫ খাচি ডিম পাওয়া গেলেও এখন তা নেমে এসেছে ২৪-২৬ খাচিতে। লোকসান সামলাতে মালিক প্রায় ২,৪০০ মুরগি অর্ধেক দামে বিক্রি করে দিয়েছেন।
পাবনা জেলা পোলট্রি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আকমল হোসেন বলেন, জেনারেটর চালাতে ঘণ্টায় প্রায় ২০০ টাকা হিসেবে প্রতিদিন ৮০০-১,০০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। বাধ্য হয়ে খামারিরা নির্ধারিত সময়ের আগেই কম দামে মুরগি বিক্রি করে দিচ্ছেন। কেউ কেউ খামার বন্ধও করে দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, পোলট্রি খাতকে বাঁচাতে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিশেষ অগ্রাধিকার, খাদ্য ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারি তদারকি এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। এসব পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দেশের ডিম ও মাংসের বাজারে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে।
পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল আমিন চৌধুরী বলেন, এটি জাতীয় সমস্যা, সারা দেশে একই চিত্র। গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যে লোডশেডিং কমে যাবে।
গরমে হিটস্ট্রোক থেকে মুরগি রক্ষায় খামারিদের স্যালাইন ও বিটেইন জাতীয় ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সরকার পোলট্রি খাতে বিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। খাদ্য ও ওষুধেও ভর্তুকির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহলে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। এসব সহায়তা দ্রুত বাস্তবায়ন হলে খামারিরা আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।বলে জানান জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জহুরুল ইসলাম।