
পাভেল আজিম :
‘আর কি হবে এমন মানব জনম, বসব সাধুর মেলায়’—হেলায় হেলায় দিন বয়ে যায়, ঘিরে নেয় কালে। আবার কবে এমন সাধুসঙ্গে একত্রিত হতে পারবেন, সেই ভাবনা আর বিচ্ছেদের সুর নিয়ে সাঁইজির ধাম ছাড়তে শুরু করেছেন সাধু-ফকিররা।
মরমি সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়িতে আয়োজিত সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে রোববার দুপুরে পূর্ণসেবা গ্রহণের মধ্য দিয়ে। তবে লালনকে ঘিরে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আখড়াবাড়িসংলগ্ন কালী নদীর তীরে বসা গ্রামীণ মেলা চলবে আজ সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত। এরপর আগামী দোল পূর্ণিমার উৎসবে আবারও সাঁইজির ধামে মিলিত হবেন সাধু-ফকির, বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীরা।রোববার সকালে পায়েস, মুড়ি ও কলা দিয়ে বাল্যসেবা গ্রহণ করেন সাধু-ফকিররা। দুপুরে পূর্ণসেবায় ছিল ইলিশ মাছ, পাঁচ রকমের সবজির তরকারি, ডাল, ভাত ও দই। সেবা গ্রহণ শেষে একে একে আখড়াবাড়ি ছাড়তে শুরু করেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধু-ফকির ও বাউলরা। তবে সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও আখড়াবাড়ির বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট বৈঠকী আসরে এখনো শোনা যাচ্ছে লালনের মরমি গান।সাধন-ভজন, গুরুসেবা আর মরমি গানের মধ্য দিয়ে দুই দিন ধরে মুখর ছিল লালন আখড়াবাড়ি। জাতপাতের ভেদাভুলে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো সাধু-ফকির, বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীর মিলনমেলায় চলেছে ভাবের আদান-প্রদান ও লালনের মানবতাবাদী দর্শনচর্চা। কেউ গানে, কেউ আলোচনায়, আবার কেউ গুরুসেবা ও সাধন-ভজনের মধ্য দিয়ে সময় কাটিয়েছেন। তাঁদের কাছে সাধুসঙ্গ কেবল উৎসব নয়, আত্মশুদ্ধি ও মানুষকে জানার সাধনাও।গত শনিবার অধিবাসসেবার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সাধুসঙ্গ ও তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসব। লালন একাডেমির উদ্যোগে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আয়োজিত এ উৎসবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন লালনভক্ত, সাধু-ফকির, বাউল ও দর্শনার্থীরা। তাঁদের পদচারণে আখড়াবাড়ি ও কালী নদীর তীরজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।শনিবার বিকেলে উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে লালনের জীবনদর্শন শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তাঁর সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার বাণী সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।রোববার সন্ধ্যায় দ্বিতীয় দিনের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আবদুল্লাহ হারুন। সভায় লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহারসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভা শেষে রাতে বিভিন্ন শিল্পীর পরিবেশনায় বসে মরমি গানের আসর।আখড়াবাড়ির বিভিন্ন স্থানে বৈঠকী আসরে একতারা-দোতারার সুরে মগ্ন ছিলেন সাধু-ফকিররা। গানের বাণী ও ভাবের আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে তাঁরা তুলে ধরেছেন সাঁইজির মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার দর্শন। তাঁদের বিশ্বাস, সাধুসঙ্গের মধ্য দিয়ে লালনের জীবনদর্শন চর্চা ও প্রচারের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও মানবিক বোধ জাগ্রত হয়।সাধু আব্দুর রাজ্জাক সাঁই বলেন, ‘দুপুরে পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। এরপর আমরা সাধু-ফকিররা সাঁইজির ধাম ছাড়তে শুরু করেছি। আবার দোল উৎসবে সবাই একত্র হব। এটি একটি শিক্ষাকেন্দ্র। আমরা এখানে শিখতে আসি। বছরের দুটি আয়োজন আমাদের সাধু-ফকিরদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।’সাধু মনসুর সাঁই বলেন, লালন সাঁইয়ের বাণী গানের মাধ্যমে প্রচার করা হয় এখানে। সাধু-ফকিরদের মধ্যে আলোচনা ও ভাবের আদান-প্রদান চলে। সব মিলিয়ে সাধুসঙ্গ মানুষের মধ্যে লালনের দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন।লালন ভক্ত ফকির দেবরাহ্ জান্নাত বলেন, “আমরা বছরে দুটি অনুষ্ঠানে এখানে একত্রিত হই। এখানে নানা মত ও পথের মানুষ এক জায়গায় মিলিত হন। এখানকার প্রত্যেকটি মানুষ যেন একেকটি আলাদা জগৎ। কিন্তু সাধুসঙ্গ আমাদের সবাইকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়। এই মিলন, ভাবের আদান-প্রদান ও একসঙ্গে থাকার আনন্দ অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না।”এদিকে সাধু-বাউল ও দর্শনার্থীদের পদচারণে আখড়াবাড়িসংলগ্ন কালী নদীর তীরে বসেছে বিশাল গ্রামীণ মেলা। মেলায় বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের ভিড়ে মেলা প্রাঙ্গণ হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত। সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও সোমবার তৃতীয় দিনের আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগের পাশাপাশি গভীর রাত পর্যন্ত মেলায় কেনাকাটা করতে পারবেন দর্শনার্থীরা।উৎসবে আগত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। মেলাকে মাদকমুক্ত রাখতে জোরদার করা হয়েছে নজরদারি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন রয়েছেন ৮৭২ জন পুলিশ সদস্য। পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছে আনসার ও এসআরবির বিশেষ দল।১৩৬ বছর আগে কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার এই আখড়াবাড়িতে দেহত্যাগ করেন ফকির লালন সাঁই। এরপর থেকে গুরু-পরম্পরায় তাঁর মানবতাবাদী দর্শন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে আসছেন সাধু-ফকির ও অনুসারীরা। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও অধিবাস, বাল্যসেবা ও পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হচ্ছে মরমি এই সাধককে। সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও লালনের গান, দর্শন ও মানবতার বাণীকে ঘিরে আখড়াবাড়িতে উৎসবের আমেজ থাকছে সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত। এরপর দোল পূর্ণিমার উৎসবে আবারও সাঁইজির ধামে মিলিত হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরছেন সাধু-ফকির ও ভক্ত-অনুরাগীরা।
মন্তব্য করুন