
দুই বছর পরও জনআস্থা ফেরাতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ পুলিশ। দেশের বিভিন্ন স্থানে থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ, অস্ত্র লুট, যানবাহন ধ্বংস এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় কার্যত ভেঙে পড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী এ বাহিনীর কার্যক্রম। দুই বছর পর অবকাঠামোগত ক্ষতি অনেকটা কাটিয়ে উঠলেও জনআস্থা, ভাবমূর্তি ও সদস্যদের মনোবল পুনরুদ্ধারের লড়াই এখনো শেষ হয়নি।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে দেশের ৪৫০টি থানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৪৩টি থানার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আগুনে পুড়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ নথি ও মামলার আলামত। লুট হয় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ। একই সঙ্গে অগ্নিসংযোগ করা হয় পুলিশের বিপুলসংখ্যক যানবাহনে।
আন্দোলনকারীদের হামলায় ২০২৪ সালের ২০ জুলাই থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত ৪৪ পুলিশ সদস্য নিহত হন। এর মধ্যে শুধু ৫ আগস্টই নিহত হন ২৫ জন। ৪ ও ৫ আগস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় নিহত হন ১৫ সদস্য। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন কনস্টেবল—২১ জন। এ ছাড়া ১১ জন উপপরিদর্শক (এসআই), আটজন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই), তিনজন পরিদর্শক এবং একজন নায়েক নিহত হন।
পুলিশ সদরের তথ্য অনুযায়ী, প্রাণহানি ছাড়াও সব মিলিয়ে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় ১ হাজার ১৪৬টি গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে ক্ষতি হয় ২৮৫ কোটি টাকা।চলতির বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এসব গাড়ি কেনাসহ বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত জুনে মাঠপর্যায়ে পুলিশের টহল ও অপারেশনাল কার্যক্রম আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ২১২টি ডাবল কেবিন পিকআপ গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ গাড়িগুলো ক্রয়ের জন্য সরকারের মোট ব্যয় হবে ১৮২ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে এক প্রশ্নোত্তরে জানান, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলন চলাকালে সারা দেশে পুলিশের অর্ধেকের বেশি গাড়ি পুড়ে গেছে বা পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে।পুলিশের কার্যক্রমে যানবাহন সংকটের বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক গাড়ি নষ্ট হওয়ায় পুলিশের স্বাভাবিক টহল ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমে শুরুতে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছিল। তবে বর্তমান সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ লজিস্টিক সংকট কাটিয়ে উঠতে কাজ করছে। পুলিশের সক্ষমতা ফেরাতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনগুলোর জায়গায় নতুন গাড়ি পুলিশ বহরে যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলমান।দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ বাহিনীর পূর্ণ সক্ষমতা ও মনোবল ফেরাতে সবার সহযোগিতাও চেয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সংশ্লিষ্টদের মতে, পুলিশ সদস্য, যানবাহন, স্থাপনা, নথি, আলামত— এসবের বাইরে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পুলিশের ভাবমূর্তি। সাধারণ মানুষ পুলিশকে আন্দোলনের দুই বছর পর এসেও ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। প্রতিনিয়ত আস্থার সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাদের।
পুলিশের বিভিন্ন স্তরের সদস্য ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জুলাই আন্দোলন দমনে বাহিনীর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়। তাদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।সিলেট অঞ্চলের একজন পুলিশ সুপার বলেন, যে কোনো বাহিনীর তুলনার পুলিশকে সবচেয়ে বেশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়। সেই জায়গা থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। আবার কিছু কিছু রাজনৈতিক দলের সদস্যরা পুলিশকে হেয় করার জন্য মিথ্যা অপবাদ দেওয়াসহ নানা ধরনের কাজ করছেন। পুলিশ তার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে গিয়ে কারও বিরুদ্ধে গেলে পুলিশকে স্বৈরাচারের দোসর আখ্যা দিয়ে হামলার মতো ঘটনা ঘটছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৩১৭ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
ডিএমপির একজন অতিরিক্ত উপকমিশনার বলেন, জনগণের আস্থার সংকটের পাশাপাশি বাহিনীর অভ্যন্তরেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। গ্রেপ্তার, চাকরিচ্যুতি, বদলি ও প্রত্যাহার অনেকটা নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অধস্তন থেকে ঊর্ধ্বতন—সব পর্যায়ের সদস্যের মধ্যেই অনিশ্চয়তা কাজ করছে। কার কখন বদলি হবে বা চাকরি যাবে, এ উদ্বেগ স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনেও প্রভাব ফেলছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, গত দুই বছরে বাহিনীকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত থানা ও পুলিশ স্থাপনা সংস্কার, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার, সদস্যদের পুনর্বিন্যাস, প্রশিক্ষণ এবং কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদারের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে তারা স্বীকার করছেন, জনসাধারণের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসতে এখনো সময় লাগবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বাহিনীর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক আরও উন্নত করা। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশাও বেড়েছে। অপরাধের ধরন বদলে যাওয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, সাইবার অপরাধ মোকাবিলা এবং গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্ব পাচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ভাষ্য, শুধু অবকাঠামো পুনর্গঠন করলেই হবে না; পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আচরণগত পরিবর্তন, জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, আইনের সমান প্রয়োগ এবং নাগরিকবান্ধব পুলিশিং প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই বাহিনী দীর্ঘমেয়াদে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪ সালের ঘটনার পর সদস্যদের মধ্যে যে মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কাটছে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কল্যাণমূলক কার্যক্রম এবং দায়িত্ব পালনের পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে সদস্যদের মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
তাদের দাবি, বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ আগের তুলনায় অনেক বেশি সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তবে বাহিনীর ভাবমূর্তি পুনর্গঠন এবং জনগণের আস্থা অর্জনের লড়াই এখনো শেষ হয়নি।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও মাঠে দায়িত্ব পালন করতে হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেই পরিস্থিতি এখন অনেকটাই বদলেছে। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ এলাকায় পুলিশ নিজস্ব সক্ষমতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ পুলিশ পূর্ণাঙ্গ সেবা কার্যক্রম চালু করতে পেরেছে, সেটি সত্যিই উল্লেখযোগ্য। চার শতাধিক থানা ও পুলিশ স্থাপনা আক্রান্ত হওয়ার পরও বাহিনী আবার পূর্ণ সক্ষমতায় দায়িত্ব পালন করছে।’
পুলিশ ও সাধারণ মানুষের দূরত্ব কমানোর উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পুলিশকে ঘিরে সামাজিক ও ঐতিহাসিক কিছু নেতিবাচক ধারণা মানুষের মধ্যে রয়েছে। এসব দূর করতে কমিউনিটি পুলিশিং ও বিট পুলিশিং কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে।’
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ পুলিশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—অতীতের বিতর্ক পেছনে ফেলে একটি দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও জনগণের আস্থাভাজন বাহিনী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা। সেই লক্ষ্য অর্জনে কিছু অগ্রগতি হলেও দুই বছর পরও পুলিশের জন্য পথচলা সহজ হয়নি।
মন্তব্য করুন